সংখ্যালঘু তোষণের ফানুস



           Md.Zim Nawaz : রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ওরফে মমতাজ বেগম, ভোট পাওয়ার তাগিদে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে বঞ্চিত করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ফলে-ফুলে ভরিয়ে তুলছেন।ঠিক এমনটাই অভিযোগ উঠে আসছে পাঁচ বছর যাবৎ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া তে,বিভিন্ন নিউস ওয়েব পোর্টাল এ আরো কত কত জায়গায়,কেউ বা শুধু শুনে শুনে ও মন ভারী করে আছেন কেউ বা সরাসরি "তোষণ" শব্দ টি ব্যবহার করে চলেছেন  আর বিরোধীরা তো এই বিষয়কে এজেন্ডা করে সরকার পর্যন্ত ফেলে দিতে উদ্দত.কিন্তু আসলেই কি এই বহুচর্চিত বিষয়টি বাস্তবিক?. যাইহোক এবিষয়ে আর গৌরচন্দ্রিকা না করে ছোট দুই একটা পরিসংখ্যান গত উদাহরণের মাধ্যমে "মিথ এন্ড ফ্যাক্টস" যাচাই করা  যাক.

"অডিট এন্ড অ্যাকাউন্টস" বিভাগে নিয়োগের জন্য রাজ্য সরকারের পিএসসি অর্থাৎ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ফল প্রকাশ হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে।১২০টি পদের মধ্যে OBC-A (মূলত মুসলিম) এর জন্য সংরক্ষিত ছিল ১১টি আসন। ১১টি আসনের জন্য লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৪১ জনকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হয়। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়, ইন্টারভিউতে ৪১ জনই অকৃতকার্য। ফলত, অডিট এন্ড একাউন্টস বিভাগে OBC-A এর জন্য সংরক্ষিত ১১টি আসনই ফাঁকা রয়ে গেছে।অন্যদিকে একই পদে নিয়োগের জন্য OBC-B(মূলত হিন্দু) এর জন্য সংরক্ষিত ছিল ৮টি আসন। এক্ষেত্রে ৩০ জনকে ইন্টারভিউতে ডাকা হয়। মজার বিষয় হচ্ছে, OBC-B এর জন্য সংরক্ষিত ৮টি আসনের জন্যই যোগ্য প্রার্থীরা কৃতকার্য হয়েছেন। স্বভাবতই মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে..

এখন বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে, যে সমস্ত মুসলিম ছেলেমেয়েরা "OBC-এ" এর জন্য লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, তারা প্রত্যেকেই কি ভাবে ইন্টারভিউতে অযোগ্য হয়ে গেলেন? এর থেকেও আশ্চর্য বিষয়,জলপাইগুড়ি জেলার এক জন ক্যান্ডিডেট হুমায়ুন আজীজ, লিখিত পরীক্ষায় পরপর চার চার বার উত্তীর্ণ হয়ে ইন্টারভিউয়ের ডাক পান। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হল, হুমায়ুন প্রতিবারেই ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে অযোগ্য বলে ঘোষিত হন। তা হলে সংখ্যালঘু ছেলেমেয়েরা ইন্টারভিউতে সত্যিই কি অযোগ্য প্রতিপন্ন হচ্ছেন, নাকি স্বাধীনতার সাতদশক ধ’রে চলে আসা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন? ঠিক এমনটাই  বলছেন এই বিষয়ের পর্যবেক্ষক মহল । আর এক্ষেত্রে মুসলিমদের প্রতি বঞ্চনার অভিযোগ উঠলে সেটা অমূলক বলা যায় কী?

আরো একটি বিষয়,এবার সেই একই "পাবলিক সার্ভিস কমিশন" এর "গ্রুপ-ডি" পদে নিয়োগের জন্য সম্প্রতি প্রকাশিত ফলাফলের উপর একটু আলোকপাত করা যাক। গ্রুপ ডি পদে নিয়োগের জন্য সম্প্রতি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ফলাফল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।দেখা যাচ্ছে, অসংরক্ষিত অর্থাৎ জেনারেল ক্যাটাগরির জন্য কাট অব মার্কস, সংরক্ষিত OBC-A ক্যাটাগরির তুলনায় কম। অসংরক্ষিত আসনের জন্য কাট অব মার্কস ৪৬.৫, অন্যদিকে OBC-A এর কাট অব মার্কস ৪৭। অর্থাৎ এখানেও একটু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকছে ,তাহলে "গ্রুপ ডি" পদে নিয়োগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য জেনারেল ক্যাটাগরির তুলনায় সংখ্যালঘুদের (OBC-A) বাধ্যতামূলকভাবে বেশি মার্কস পেতে হয়েছে। কিন্তু সংরক্ষণের নিয়মে এটা কি বাস্তবসম্মত? এই বিষয় নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তুলছে বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্বরা.


সাধারণত,যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রথমে সকলেই অসংরক্ষিত আসন অর্থাৎ জেনারেল আসনের জন্য প্রতিযোগিতা করেন। অসংরক্ষিত আসনের জন্য প্রতিযোগিতায় অকৃতকার্য হলে তারপরেই নিজেদের জন্য সংরক্ষিত আসনের জন্য তারা প্রতিযোগিতা করবেন। স্বাভাবিকভাবেই সরল পাটিগণিতের হিসেবে, সংরক্ষিত আসনের জন্য নির্ধারিত কাট অব মার্কস, অসংরক্ষিত আসনের কাট অব মার্কসের চেয়ে সবসময়েই বেশি হবে। কিন্তু গ্রুপ ডি-র ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। এক্ষেত্রে ফলাফল দেখলে সহজেই বোঝা যায়,  সংরক্ষণের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। OBC-A এর প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করানো হয়েছে তাদের নির্ধারিত সংরক্ষণের ভেতরেই, অসংরক্ষিত আসনের জন্য প্রতিযোগিতা করতে দেওয়া হয়নি।

এবার একটু জেনে নেয়া যাক , সংরক্ষিত আসনের প্রতিযোগীদের যদি অসংরক্ষিত আসনের জন্য প্রতিযোগিতা করতে না দেওয়া হয়, তাহলে সংরক্ষণের আসলে কারা লাভবান হচ্ছেন?..রাজ্যের ৮৫ শতাংশ মানুষ সংরক্ষণের আওতাধীন। বাকী ১৫ শতাংশ মানুষ জেনারেল ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। ৮৫ শতাংশের জন্য সংরক্ষিত আসন ৪৫ শতাংশ। ৫৫ শতাংশ আসন অসংরক্ষিত। এখন প্রশ্ন হল, ৮৫ শতাংশ  যদি শুধুমাত্র তাদের নিজেদের জন্য সংরক্ষিত ৪৫ শতাংশ আসনের বাইরে প্রতিযোগিতা করতে না পারেন, তাহলে বাকী ৫৫ শতাংশের জন্য কারা প্রতিযোগিতা করবেন? হিসেবটা এরকম দাঁড়াচ্ছে, ৫৫ শতাংশ অসংরক্ষিত আসনের জন্য মাত্র ১৫ শতাংশই প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মাত্র ১৫ শতাংশ জেনারেলের জন্য ৫৫ শতাংশ আসন অটোমেটিক্যালি সংরক্ষিত হয়ে যাচ্ছে। তাহলে হিসেব অনুযায়ী, সংরক্ষণের জন্য আসলে জেনারেল ক্যাটাগরীর প্রতিযোগীরাই লাভবান হচ্ছেন। যদিও এমনটা হওয়া উচিত না বলে দাবি এই বিষয় এ পর্যবেক্ষক মহলের ।

অবশেষে সংরক্ষণের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করার কারণেই যে সংরক্ষিত বিশেষত এই রাজ্যের সংখ্যালঘুরা  প্রতারিত হচ্ছেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এটাকে কী বলা যায়? তোষণ নাকি বঞ্চনা?তাই তথ্য সহকারে প্রশ্নের মাধ্যমে একশ্রেণীর মানুষের মাথার ভেতর দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবৎ লালিতপালিত ‘মুসলিম তোষণ’ নামক শব্দের ফানুসটি ফুটো করে দিতে এটাই নাকি যথেষ্ট বলছেন ভুক্তভোগীরা ।

Share on Google Plus Share on Whatsapp



0 comments:

Post a comment