নিয়তি না প্রহসন নাকি অবহেলা?দায় কে নেবে সরকার না ঈশ্বর?

মেহেদি হাসান মোল্লা:এ দেশে খালি পেটে রোজ রাতে শুতে যাওয়া শিশুদের সংখ্যাটা গত তিন বছরে বেড়েই চলেছে। বেড়েছে অপুষ্টি। স্রেফ খেতে না পেয়ে আরও বেশি শুকিয়ে যাওয়া কচি কচি মুখগুলোর সংখ্যাও বেড়েছে লাফিয়ে।সাম্প্রতিক১১৯টি দেশের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের (গ্লোবাল হাংগার ইনডেক্স বা জিএইচআই) এই ফল প্রকাশ করতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, এ দেশের ক্ষুধার প্রকৃত চেহারাটা। বাইরের চাকচিক্য, অচ্ছে দিনের ঢাকঢোল,স্বচ্ছভারত অভিযান,ডিজিটাল ইন্ডিয়া, উন্নয়নের গর্বিত প্রচার যে আসলে নেহাতই ফাঁপা, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে এই আন্তর্জাতিক সমীক্ষায়।
শিশুদের অপুষ্টি, বাড়বৃদ্ধি, শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান-সহ একাধিক বিষয়ে সমীক্ষা চালিয়েই এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এ বারের রিপোর্টে দেখা গেছে, এ দেশের পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের প্রতি পাঁচ জনের এক জনের ওজন উচ্চতা সাপেক্ষে অত্যন্ত কম। প্রতি তিন জনের এক জন বয়স অনুপাতে খর্বকায়।
 বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু উদ্বেগজনক নয়। পরিস্থিতি গুরুতর-র থেকেও ভয়াবহ।এমন রিপোর্টে উদ্বিগ্ন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অর্থ মন্ত্রকের রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছেন।বিরোধীদের দাবি ছিল মোদী জমানায় গরিবদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। এই রিপোর্ট সেই অভিযোগকেই আরও সামনে এনে দিল।
২০১৪ সালে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ৭৬টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ছিল ৫৫। ২০১৬-য় ১১৮টি দেশের মধ্যে তা নেমে আসে ৯৭-এ। আর এ বছর ১১৯টি দেশের মধ্যে নেমে এল ১০০য়! দিনদিন ভারতের স্থান তলানিতে ঠেকছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক বা উত্তর কোরিয়া এমনকী নিকটতম প্রতিবেশী নেপাল বা বাংলাদেশেরও নীচে নেমে গিয়েছে ভারত! 

বিশেষজ্ঞ দের মতে সার্বিক পুষ্টির লক্ষ্যে দেশে যত বড় মাপের প্রকল্পই চালু করা হোক, খরা ও পরিকাঠামোগত ত্রুটির কারণে গরিবদের একটা বিরাট অংশের মধ্যে অনাহারজনিত অপুষ্টির ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।মোদীর নোট বাতিল সিদ্ধান্তে দেশের জিডিপি ক্রমশ নিম্নমুখি।সব কালো টাকা ফিরে আসবে এমন স্বপ্নের দিন শেষ।প্রথম প্রথম আমজনতা মোদি বাক্য গুলো গিলে গিলে খেলেও এখন অবশ্য হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।গরিব শ্রেনীর মানুষ 
দের উপর দেওয়া প্রতিশ্রুতি এখন ও মেটাতে পারেনি।মেটাতে পারেনি চাষি দের ঋন।

গুজরাটে গরীব  চাষীদের থেকে জোর করে জমি কেড়ে নেওয়ায় সেখানে চলছে প্রতিবাদী অনশন।এক বুক মাটির নিচে ঢুকে মাটি আঁকড়ে বসে রাত কাটাচ্ছে সাধারন মানুষ।ঋনের ভারে কৃষক আত্মহত্যা বেড়েই চলেছে।কিছুদিন আগেই তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলায় ঋণগ্রস্থ কৃষক পরিবারের বাচ্চা সহ ৪ জন ডিএম অফিসের সামনে গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে যাতে করে তাদের দাবি গুলো সবার দৃষ্টিগোচরে আসে।

তবুও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই সরকারের।নেই কোন হেলদোল। অথচ কিছু অপ্রয়জনীয় জিনিস নিয়ে চলছে হুল্লড়।চলছে গো-রক্ষক দের তান্ডব।ধর্মীয় ভেদাভেদ।অত্যাচারিত হচ্ছে দলিত শ্রেনীর মানুষরা। এদিকে যোগী আদিত্যনাথকে ইউপির মুখ্যমন্ত্রী বাছাই করে  বিজেপি খুব ভালো চমক সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তারপর থেকে দেখা যাচ্ছে যোগী আদিত্যনাথজি নিজেই রোজ একটা করে চমক সৃষ্টি করে চলেছেন। বলা যায়, প্রায় প্রতিদিনই নানা খবরের শিরোনামে উঠে আসে যোগীর রাজ্য উত্তরপ্রদেশের নাম। অথচ ইনিংসের শুরুটা তিনি কিছুটা আশা জাগিয়ে করেছিলেন।রাতারাতি বেশ কিছু সাহসী সিদ্ধান্তের কথাও ঘোষণা করেছিলেন তিনি।
 তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, গরিব চাষিদের জন্য ঋণ মকুব, সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য সরকারি কর্মীদের ছুটির দিন কমিয়ে আনা, গরিব মানুষের কাছে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া,দারিদ্রতা দুরিকরন।  কিন্তু যোগী ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যে তাঁর কয়েকটি পদক্ষেপ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার পক্ষে খুব একটা ভরসাযোগ্য হয়ে উঠল না। তিনি দলের কর্মীদের কিছু কিছু কাজে ব্যবহার করতে উদ্যোগী হওয়াতেই প্রাথমিকভাবে গোল বাঁধল।
 যেমন অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াড তৈরি বা গোরক্ষকদের প্রকারান্তরে উৎসাহদান ইত্যাদি। এ তো গেল একটা দিক। কিন্তু সবথেকে বড় যে ঘটনা যোগী সরকারকে অপ্রস্তুতে ফেলে দিল, তা হল শিশুমৃত্যুর ঘটনা। 
উত্তরপ্রদেশে বাবা রাঘব দাস শিশু হাসপাতালে যেভাবে অক্সিজেনের অভাবে পাঁচ-ছ’ দিনে ৬০-৭০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাতে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে আসে। 

কয়েকটা দিন উত্তরপ্রদেশের ওই শিশু হাসপাতাল হয়ে উঠেছিল মৃত্যুভূমি। তখন একে অপরকে দোষারোপের পালা চলেছিল। এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল, যোগী আদিত্যনাথ যত বড় সিংহপুরুষই হোন না কেন, তাঁর প্রশাসনের ভিতরে গলদ আছে। যে ত্রুটিগুলি এইসব অসহায় শিশু মৃত্যু দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেল।এখনও প্রতিনিয়ত শিশু মৃত্তুর খবর উঠে আসে যোগীর রাজ্য থেকে।
অথচ সে বিষয়ে যোগীর কোন ভ্রক্ষেপই নেই।এখন ইউপিকে বিজেপির রঙ এ মুড়তে ব্যাস্ত।মুখ ঢেকে যায় গেরুয়া রংএ।অবশ্য এই রঙ  বিজেপির গেরুয়া রঙ না এটা নাকি ত্যাগের প্রতিক যেটা জাতীয় পতাকেতে আছে।পতাকাতে সাদা রঙও তো আছে যেটা শান্তির প্রতিক তাহলে সাদা রঙ এ ঢেকে ফেলা হল না কেন?যোগী কি তাহলে শান্তি চান না নাকি ইউপি বাসীরা শান্তি চান না?এই প্রশ্নের উত্তর হয়ত এখন পাওয়া যাবে না।ইউপিতে আবার কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে বৃহত্তম রামের মূর্তি গড়তে চলেছে যোগীজি অথচ প্রতিনিয়ত শত শত নিস্পাপ রামের অকাল মৃত্তু ঘটে চলেছে তা নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই আপাতত।
সব মিলিয়ে যোগী সরকার যে প্রত্যাশা সৃষ্টি করে ক্ষমতায় এসেছিল, তার মর্যাদা তিনি রাখতে পারেননি। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যে অপরাধ অনেক বেড়ে গিয়েছে। খুন, শিশু মৃত্তু,ধর্ষণের ঘটনা দিনদিন বাড়ছে। লক্ষ কোটি টাকা ব্যায়ে বুলেট ট্রেন,কোটি কোটি টাকা মূর্তি নির্মানে বিনিয়োগ হচ্ছে অথচ সারা দেশে অভুক্ত,না খেতে পারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।যেন গরিব মানুষের বুকের উপর দিয়ে বুলেট চালিয়ে দিচ্ছে। এর দায় কে নেবে?

"ক্ষূধাতুর শিশুর কামড়ে
মায়ের বুক আজ স্তব্দ
হাহাকার খাবারের জন্যে
বিবেক যে তাড়নায় তপ্ত...
 নন্দদুলাল যখন খেয়ে খেয়ে মরে
আমার গরীব শিশু ধুঁকে ধুঁকে মরে"
Share on Google Plus Share on Whatsapp



0 comments:

Post a comment