সমপ্রীতির এক মেলবন্ধন শাকসহরের বামন পীরের মেলা

স্নেহাশিষ মুখার্জি :আনুমানিক প্রায় ৩০০ বছর আগে "বামনপীর" বাবার আবির্ভাব ঘটে শাকসহরের জঙ্গলে | সেখানে এক রাখাল গরু চড়াতে গিয়ে একটা ৩ -৪ বছরের শিশুকে ক্রন্দন রত অবস্থায় দেখে | তাকে নিয়ে আসা হয় এই গ্রামে যা বর্তমানে ভাঙ্গর ১নম্বর ব্লকের অন্তৰ্গত | তার পরিবারের সম্পর্কে জানতে চাইলে সে কিছুই বলতে পারে না | তখন একজন সন্তানহীন দম্পতি তাঁকে দত্তক নিয়ে বড় করে | শিশুটি "বাবুরালা" নামে পরিচিত লাভ করে | কিন্তু শিশুটি যত বড় হতে থাকে ততই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা প্রকাশ পেতে থাকে | বিভিন্ন মানুষকে ছুঁয়ে দিয়ে,জল পড়া,তেল পড়া  দিয়ে সে  বিভিন্ন দূরারোগ্য ব্যাধিকেই সারিয়ে তুলতে থাকে | 

এই ভাবে বালকটির মধ্যে আশ্চর্য্য ক্ষমতা ও অলৌকিকতা দেখে মানুষের মনে ক্রমশই ছড়িয়ে পরলো যে এ বালক সাধারণ বালক নয় | তখন থেকেই সাধারণ মানুষরা তাঁকে "বামনপীর" নামেই  প্রচার করতে থাকে | আর স্থানীয় মানুষের দেওয়া নামেই আজ তাঁর নাম "বামনপীর"| কথিত আছে বামনপীর যখন পর্দা নিলেন তখন সেখানে স্থাপিত হয় মাজার শরীফ | 


এই মাজার শরীফে বাবার কোবরেস্থানের সামনে একটা কুয়ো থেকে আপনা আপনি এক জাতীয় তেল ওঠে, যার টানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষকে বার বার বাবার দরবারে আসতে হয় তাঁদের দাবী-দাওয়া পূরণের জন্য | কথিত আছে বাবাও ভক্তদের বিমুখ করেন না | ভক্তিভরে ডাকলে বাবাকে নাকি পাওয়া যায় | 

বাবা আগে তেলপোড়া দিয়ে মানুষকে রোগ ,শোক ,তাপ থেকে রক্ষা করত , তৎকালীন সময়ে ভক্তরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করত বাবা আপনি যদি  আমাদের ছেড়ে চলে যান তাহলে কে  আমাদের এই ধন্বন্তরি ওষুধের পরিষেবা কে ডেবে ? কেই বা আপনার উত্তরসূরি হিসাবে আমাদের রোগ ,শোক ,তাপ থেকে রক্ষা করবে ? বাবা বলেছিলেন  সৃষ্টি কর্তার ডাকে সারা দিয়ে আমি চলে গেলেও ওনার কৃপায় আমার এই পরিষেবা তোমাদের জন্য বন্ধ হবে না কোনোদিন  | 

যার প্রমান হিসাবে বাবার কবর স্থানের পাশে এই ছোট্ট তৈল কুয়ো  আর  যেখান থেকে একবার পৌষ সংক্রান্ত্রির দিন থেকে পুরো ৭ দিন এই তেল ওঠে | এই তেলের সঙ্গে সর্ষের  তেল মিশিয়ে এখন পর্যন্ত্য এই তেল পোড়া আধ্যাত্মিক মনস্ক মানুষের কাছে এক ধন্বন্তরি ঔষধের সমান গুরুত্ব ,বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে আগত অসংখ্য ভক্তের আগমণই তা প্রমাণ করে | কথিত আছে বাবার এই তেল ব্যবহারে ক্যান্সার, টিউমার্,কিডনিতে পাথর , ঘা -পাঁচড়া বিভিন্ন রোগ সেরে যায় ..


ফলে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত জাতি ধর্ম বর্ণ পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে মানুষ এখানে যাতায়াত করে , তবে আগতদের মধ্যে বেশির ভাগই হিন্দু সম্প্রদায় |এই পৌষসংক্রান্ত্রি তে তেল নেয়া কে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল  কে কেন্দ্র করেই  শাকসহরে বামনপীর  মেলার সূচনা হয় |
এই মেলা চলে একমাস ধরে | আর এই মেলায় প্রতিদিন  কমপক্ষে ৬০ থেকে ৮০ হাজার মানুষের সমাগম হয় , আর প্রতি রবিবার দূরদূরান্তের থেকে দুই- তিন লক্ষ ভোক্তর  আগমন ঘটে | আর এই ভাবে এই মেলাকে কেন্দ্র করে সার্কাস , জাদু খেলা , নাগরদোলা , ভাগ্যবিচার ,মিউজিয়াম এবং গ্রামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ পুতুল নাচও হয়,বসে অসংখ গ্রাম পল্লীর দোকান| 
এই মেলা কমিটির সম্পাদক ইব্রাহিম কয়াল আমাদের ওয়েব মাধ্যমকে জানান যে  "৮০ জন স্বেচ্ছাসেবী আমাদের তরফ থেকে মেলায় পরিষেবা দিচ্ছে এবং পাশাপাশি প্রশাসনের তরফ থেকেও ৮ জন পুলিশ সহ ২০ জন সিভিক এই মেলায় পরিষেবা দেবার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে যদিও আমার এই দীর্ঘ ২৭ বছরের অভিজ্ঞতায় আজ পর্যন্ত কোনো দিন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে দেখিনি | এই মেলা গ্রামের এক ঐতিহ্য | এই এলাকার মানুষজন গর্ব বোধ করে এই ৩০০ বছরের মেলাকে নিয়েআর সর্বোপরি এটি জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এক মিলন ক্ষেত্র" 
Share on Google Plus Share on Whatsapp



0 comments:

Post a comment