পীরেরহাট পাড়াতে 'বাবা বা মা' কাউকেই বিমুখ করেন না তাই মা জগদ্ধাত্রীকে দর্শণ করার পর পীরবাবাকেও দর্শণ করেন সব আগন্তুকরা !!



স্নেহাশিস মুখার্জি ,  নদীয়া , ১৩ নভেম্বর 
আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগে অবিভক্ত বাংলার নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে  শুরু হয়েছিল পীরেরহাটের  জগদ্ধাত্রী পুজো |  একপাশে পীরেরহাট  আর তার হাত দুয়েক দূরে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থান করছেন মা জগদ্ধাত্রী | ঐতিহ্যমন্ডিত শান্তিপুরে বহু প্রাচীনকাল থেকেই ছিল হিন্দু মুসলিমের সহাবস্থান যা  উভয়সম্প্রদায়ের মেলবন্ধনের প্রতীক হিসাবেই দেখে আসছেন মানুষ | পীরেরহাটের   জগদ্ধাত্রীপুজোর সম্পাদক শৈলেন সাহা জানান " বর্তমানে যেখানে জাত , পাত , ধর্ম নিয়ে একশ্রেণির বিভেদকামী মানুষ ভেদাভেদ সৃষ্টি করে চলেছে , ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে শান্তিপুরে সূত্রাগরের পীরেরহাট  যেন একই সূত্রে বেঁধে রেখেছে হিন্দু ও মুসলমানকে | এখানে এখনও রাজনীতির দূষণ ঢোকেনি | তাই ত হিন্দু হোক বা মুসলিম পীরের  মাজারে উভয়সম্প্রদায়ের মানুষেরই অবাধ প্রবেশ " | 

অন্যান্য জগদ্ধাত্রী পুজো থেকে এই পুজোর মণ্ডপটা অবস্থানগতভাবে অনেকটাই আলাদা অনেকটাই স্বতন্ত্র বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা | কারণ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে এমন খুবই কম জায়গা আছে যেখানে মন্দির আর মাজারের সহাবস্থান | স্থাণীয় মানুষেরা জানান এখন ধারাবাহিক ভাবে প্রথা চলে আসছে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ঘরে যদি কোন বাছুর হয় তাহলে পীরের মাজারে দুধ ঢালার | আর ঠিক এই মাজারের পাশেই মা জগদ্ধাত্রীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা যা বর্তমানে সুত্রাগরের পীরেরহাট  পাড়া জগদ্ধাত্রী পুজো কমিটি নামে খ্যাত | কথিত আছে বহু প্রাচীনকালে মাজারের পাশে হাট বসত | সেই থেকেই এলাকার নাম হয় পীরেরহাট  | প্রাচীন এই পুজোয় আজও নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নামেই সংকল্প হয় বলেই জানান স্থাণীয় মানুষজন | নবমীতেই সপ্তমী , অষ্টমী , নবমীর পুজো হয় | এই পুজোর প্রধান বৈশিষ্ট যতক্ষণ পুজো চলে ততক্ষন হোমকুন্ডও জ্বলে | পুজো হয় একদিনই | বলি দেওয়া হয় আঁখ , কুমড়ো | 


তবে এই পুজোতে মাইক বাজান হয় না | কথিত আছে যতবারই এই বারোয়ারিতে মাইক নিয়ে আসা হয়েছে ততবারই মাইক চলতে চলতে খারাপ হয়ে গেছে | আবার কোন কোন সময় মাইক চালানোই যায় নি | পুজোর সময়ই হোক বা অন্য দিনগুলিই হোক মণ্ডপের পাশাপাশি এখানে পিরের মাজারের গুরুত্বও প্রশ্নাতীত | বিগতদিন থেকে বর্তমানে মাজার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা থেকে শুরু করে সংষ্কার পুরোটাই দেখভাল করেন পুজো কমিটির কর্মকর্তারাই | সারাবছর এই মাজার দেখভাল করেন মূলতঃ এলাকার হিন্দুরাই | তবে তাই বলে মুসলিমরা এখানে ব্রাত্য নন | বহু দুর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এই পীরবাবার কাছে | যাঁরা মন্দিরে আসেন তাঁরা যেমন পীরবাবার মাজারে মাথা ঠোকেন ঠিক তেমনই যাঁরা মাজারে আসেন পীরবাবার দর্শনে তাঁরাও মন্দিরে আসেন মায়ের আশীর্বাদের ফুল নিতে মায়ের পায়ে মাথা ঠেকাতে | বাবা বা মা কাউকেই বিমুখ করেন না | কথিত আছে পীরবাবার দর্শণ করার পর যেমন ভক্তদের মা জগদ্ধাত্রীকে দর্শণ করতেই হবে ঠিক তেমনই জগদ্ধাত্রীকে দর্শণ করার পর পীরবাবাকেও দর্শণ করা চাইই চাই | শোনা যায় না হলে ভক্তদের মনোবাঞ্ছা অপূর্ণ থাকে | তাইতো বৈচিত্রের মধ্যেও ঐক্যের ছোঁয়া এখন নদিয়ার শান্তিপুরে |
Share on Google Plus Share on Whatsapp



0 comments:

Post a comment